দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো কতটা জনবান্ধব হতে পেরেছে?

দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো কতটা জনবান্ধব হতে পেরেছে?

তৌহিদুর রহমান: শুরুটা করি একেবারেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। ব্যস্ত ঢাকা শহরের যান্ত্রিকতা ছেড়ে আর ১০টা মানুষের মতোই ঈদের ছুটিতে গিয়েছিলাম গ্রামের বাড়িতে। হাতে মোবাইলের মতো একটা অত্যাধুনিক যন্ত্র থাকায় ঈদের ছুটিতেও পরিচিত সবার সঙ্গেই যোগাযোগ থাকবে প্রত্যাশা ছিল এমনই; কিন্তু এক্ষেত্রে পুরোপুরি হতাশই হতে হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে যেখানে ইন্টারনেট ছাড়া একটি দিনও ভাবা যায় না, সেখানে গ্রামে কথা বলার জন্য প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক পাওয়াই দায়। এমনকি দুটি ফোনে চারটি সিম থাকলেও এর একটি দিয়েও স্বাভাবিকভাবে প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারিনি। এর মধ্যে তিনটি অপারেটরের সিম অধিকাংশ সময়ই ছিল নেটওয়ার্কবিহীন। আজকের এই প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে এখনও এই অবস্থা! ভাবা যায়?
তবে এ ধরনের অভিজ্ঞতা কিন্তু শুধু আমার একার নয়। আমার মতো পরিচিত আরও অনেকেই গ্রাম কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে জীবিকার তাগিদে কিংবা চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন। তাদের অনেকেই গ্রামে গিয়ে এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। যারা চাকরি বা কর্মসূত্রে অন্যান্য বড় শহরে থাকেন, গ্রামে গিয়ে তারাও জানালেন একই ধরনের কথা। অর্থাৎ একটি বিষয় স্পষ্ট, মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলা কিংবা ইন্টারনেট সেবা এখনও গ্রামাঞ্চলে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। অথবা বলা চলে, গ্রামে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ ধরনের মানসম্মত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে মোবাইল অপারেটরগুলো। পুরোপুরি জনবান্ধব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান তারা হয়ে উঠতে পারে। অথচ তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সেবাপ্রাপ্তি প্রত্যাশিত। এ অবস্থার মধ্যেই দ্রুতগতির ফোরজি সেবা চালুর পর এখন ফাইভজি চালুর ব্যাপারে তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে সবখানে।
চলতি শতাব্দীর শুরু থেকেই মোবাইল ফোন বিশ্বব্যাপী যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে, যদিও মোবাইল ফোন যুগের সূচনা হয়েছে আগের শতাব্দীতেই। ইন্টারনেটসহ কম্পিউটার প্রযুক্তির অনেক কিছুই মোবাইলে যুক্ত হওয়ায় বলতে গেলে সারা বিশ্বের সব এখন মানুষের হাতের নাগালে। বাংলাদেশেও মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছে তিন দশক হতে চলল। মানুষের হাতে হাতে এখন মোবাইল তথা স্মার্টফোন। মোবাইল অপারেটরগুলো সর্বোচ্চ প্রযুক্তিবিশিষ্ট ফোরজি ইন্টারনেট সেবাও চালু করেছে। সেদিক দিয়ে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ মানের সেবা পাওয়ার কথা গ্রাহকদের। কিন্তু সে সেবা কি দেশের মানুষ পাচ্ছে? ওপরের আলোচনা থেকে সে বিষয়ে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৫ কোটির অধিক। অবশ্য এটি সিম বিক্রির হিসাব। জনপ্রতি সিম ব্যবহারের সংখ্যা একাধিক হওয়ায় প্রকৃত গ্রাহক হয়তো এর অর্ধেক কিংবা তারও কম হবে। তবে ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে যদি পাঁচ কোটি মানুষও একটি করে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তাও বিশাল। এক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরগুলোর কাছ থেকে তারা সর্বোচ্চ মানের সেবাটাই প্রত্যাশা করে, কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই।
মোবাইল ফোন প্রযুক্তির স্বর্ণযুগে এসেও দেশের ব্যবহারকারীরা এখনও বেশ হতাশই বলা চলে। উন্নতমানের সেবাপ্রাপ্তি দূরে থাক, স্বাভাবিক সেবাটাই এখনও মিলছে না। দেশের মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকেই রয়েছে তাদের সেবা শহরাঞ্চলে কিছুটা ভালো হলেও গ্রামে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছায়নি। এবার নিজেও গ্রামে গিয়ে সে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। অথচ অপারেটরগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়, গ্রামে-বনে-জলে-জঙ্গলে-পাহাড়ে যেখানেই যাবেন, সেখানেই নেটওয়ার্ক পাবেন। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে এর মিল কোথায়? ভালো সেবা নিশ্চিত না করেই এমন চটকদার বিজ্ঞাপন দেওয়ার মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে কি না, সে ধরনের প্রশ্নও তোলার অবকাশ রয়েছে।
মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে আসা গ্রাহকদের অভিযোগের নিষ্পত্তি করে থাকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)। প্রতিবছর সেখানে অভিযোগের যে পরিসংখ্যান সামনে আসে, তা সত্যিই হতাশাজনক। গত ডিসেম্বরে বিটিআরসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র আট মাসে বিটিআরসিতে গ্রাহকরা অভিযোগ করেন তিন হাজার ৩৩৫টি। এর মধ্যে কল ড্রপ নিয়ে ২১টি, নেটওয়ার্ক কাভারেজ সমস্যা নিয়ে ৭২২টি, ইন্টারনেটের কম গতি নিয়ে ১০৭টি, ইন্টারনেট ভলিউম নিয়ে ১১৪টি, ফ্রড কার্যক্রম নিয়ে ৪৯টি, এমএফএস ব্যাংকিং নিয়ে চারটি, প্যাকেজ অফারে প্রতারণা নিয়ে ১৫টি, কুইজ প্রতিযোগিতা নিয়ে ৯৬টি, রিচার্জ নিয়ে ৩৮৩টি, সিম বার নিয়ে এক হাজার ৫৮৭টি, মার্কেটিং এসএমএস নিয়ে ১২৫টি, ভাস নিয়ে ১১০টি ও ভয়েস কলের মান নিয়ে দুটি অভিযোগ করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট, মোবাইল অপারেটরগুলো যত ধরনের সেবা দিয়ে থাকে, তার সবকটি নিয়েই গ্রাহকের অভিযোগ রয়েছে। তবে এগুলো শুধু আনুষ্ঠানিক অভিযোগ। এর বাইরে আরও অনেকেই নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হলেও বাড়তি ঝামেলা এড়াতে কোনো অভিযোগ করেন না। আবার অনেকেই মনে করেন, অভিযোগ করা হলেও কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। এছাড়া গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকরা অভিযোগ করেন না বলতে গেলে চলে। কারণ তাদের অনেকে কীভাবে অভিযোগ করতে হয়, সেই নিয়মটাই জানেন না। কিছু মানুষ জানেন, সমস্যা হলে ১২১ কিংবা কল সেন্টারে ফোন করতে হয়। তবে তাতেও অনেক মারপ্যাঁচ থাকায় কেউ বাধ্য না হলে কল দিতে চান না। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নিয়েও নানাভাবে প্রতারিত হচ্ছেন মোবাইল কিংবা স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা। নানা কৌশলে প্রতারকরা গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিটিআরসির বিরুদ্ধেও অভিযোগের শেষ নেই। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, বিটিআরসিতে বিভিন্নভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। সেখানে অসংখ্য অভিযোগ গেলেও কার্যকর সমাধান মেলেনি। বরং সংস্থাটি অপারেটরদের পক্ষ নিয়েছে বলে মনে করছেন তারা। এসব অভিযোগ কিন্তু শুধু মুখের কথা নয়, টেলিযোগাযোগ নিয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই এসব অভিযোগ উঠেছে। চলতি মাসেই অনুষ্ঠিত ওই গণশুনানি নিয়ে গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওইসব অভিযোগের ব্যাপারে বিটিআরসি কিন্তু সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। অথচ সরকারি সংস্থা হিসেবে বিটিআরটির কাজ হওয়া উচিত গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা, অপারেটরদের স্বার্থ রক্ষা করা নয়।
মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে আগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ করার সুযোগ ছিল। সে সময় অভিযোগ নিষ্পত্তির হারও ছিল সন্তোষজনক। তবে এখন বিটিআরসিতে অভিযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অনীহা রয়েছে। এছাড়া অপারেটরদের পক্ষ নেওয়ারও কথা বলছেন অনেকে। অথচ অপারেটরবান্ধব না হয়ে গ্রাহকবান্ধব হওয়ার কথা বিটিআরসির। গণশুনানি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বিটিআরসি মোবাইল অপারেটরদের দিকেই পক্ষপাতিত্ব করছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা। এছাড়া গ্রাহকেরা যে অভিযোগ করেছেন, তার পক্ষে অপারেটররা মতামত না দিলেও কমিশন কেন তাদের পক্ষপাতিত্ব করছেÑএমন প্রশ্নও উঠছে।
দেশে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর সেবার মান নিয়ে অভিযোগ নতুন কিছু নয়, দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। শহরাঞ্চলে তাদের সেবার মান কিছুটা উন্নত হলেও গ্রামে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিস্থিতি বেশ নাজুক। ফোরজি নেটওয়ার্ক চালু হলেও অনেক স্থানে টুজিও ঠিকমতো মিলছে না। অথচ দেশে মোবাইল গ্রাহক ক্রমেই বাড়ছে, অপারেটরগুলোর আয়-মুনাফার ধারাও ঊর্ধ্বমুখী। সরকার তাদের প্রয়োজনীয় নানা ধরনের সুবিধাও দিচ্ছে। সবকিছু অনুকূলে থাকা সত্ত্বেও সেবার মান সন্তোষজনক না হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যাপারটি সম্বন্ধে কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসিও অবগত। সেবার মান বাড়াতে নানা ধরনের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। তার পরও সমস্যার সমাধান না হওয়া হতাশাজনক। বিষয়টি খতিয়ে দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সময় সম্ভবত চলে এসেছে।
গ্রাহকরা অভিযোগ তুলেছেন ভয়েস কলের মূল্যবৃদ্ধি, এমএনপি’র ডিপিং চার্জ এবং ফোরজি সেবাপ্রাপ্তি নিয়ে। ফাইভজি সম্বন্ধে গ্রাহকদের মতামত নেওয়া হয়নি। এছাড়া প্রযুক্তির অপব্যবহার, ফিক্সড ইন্টারনেট ব্যবসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এগুলো খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন সন্দেহ নেই। কল রেট বা ইন্টারনেটের খরচ নিয়েও খোদ অপারেটরগুলো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। মেসেজ দেওয়ার পাশাপাশি নানাভাবে গ্রাহক হয়রানির কথা প্রায়ই শোনা যায়। মেসেজিং নিয়ে কথাও কম হয়নি। এছাড়া প্রায়ই দেখা যায়, গ্রাহকের অজান্তেই অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের নম্বর চলে যাচ্ছে। পরে নানা ধরনের বিজ্ঞাপনের বার্তা তাদের কাছে যাচ্ছে। অথচ এগুলো অনেক গ্রাহকই পছন্দ করেন না। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।
যেহেতু মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো সেবার দেওয়ার মাধ্যমে ব্যবসা করে থাকে, সেক্ষেত্রে তাদের অবশ্যই কাক্সিক্ষত মানের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া কলরেট কিংবা অন্যান্য চার্জ-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে গ্রাহকদের মতামত নেওয়ার দাবি এসেছে। এটি গুরুত্বসহ ভেবে দেখতে হবে। ফাইভজি নেটওয়ার্ক চালুর কথাও সামনে আসছে। তবে এখনও ফোরজি নেটওয়ার্ক অবকাঠামোই সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ অবস্থায় ফাইভজি চালুর আগে সবকিছু ভেবে দেখতে হবে। ফাইভজি নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ প্রস্তুতির পরই আসা উচিত। আর শুধু শহরেই নয়, গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ভালো মানের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এতে গ্রাহকরা অন্তত ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাবেন, ভালো মানের সেবা পাবেন।

শেয়ার বিজ নিউজ

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here