টেলিটকে নতুন বিনিয়োগ

রাশেদ মেহেদী : টেলিটককে নতুন করে দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে সৌদি টেলিকমের কাছ থেকে প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা আট হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্যে একটি বিস্তারিত প্রকল্প পরিকল্পনাও (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। এসব বিনিয়োগের লক্ষ্য হবে টেলিটকের জন্য আরও প্রায় ১০ হাজার বিটিএস স্থাপন করে দক্ষ নেটওয়ার্ক তৈরি করা।

এ প্রসঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেছেন, সারাদেশে টেলিটকের নেটওয়ার্ক অন্য প্রতিযোগীদের সমান সক্ষমতায় গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে তাতে সফল হওয়ার আশা করেছেন মন্ত্রী।

টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহাব উদ্দিন সমকালকে বলেন, ঢাকায় টেলিটকের নেটওয়ার্ক খুবই ভালো। এখন যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সারাদেশে সম্প্রসারণ করা গেলে টেলিটক কম সময়ের মধ্যেই অনেক বেশি গ্রাহক পাবে। কারণ এখন পর্যন্ত টেলিটকেই ভয়েস কল এবং ইন্টারনেটের খরচ সবচেয়ে কম। দেশের মানুষ চায় টেলিটক ব্যবহার করতে।

বিশ্নেষকরা বলছেন, টেলিটকে শুধু বিনিয়োগ নয়, পাশাপাশি এর ব্যবস্থাপনায়ও বড় পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে টেলিটককে বারবার প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে।

যে কারণে পিছিয়ে টেলিটক :তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, টেলিটকের বেতার তরঙ্গ এবং ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক অন্য বেসরকারি তিনটি অপারেটরের প্রায় সমান কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি। তার পরও বিনিয়োগে বিপুলভাবে পিছিয়ে আছে টেলিটক। দেশে মোবাইল অপারেটরদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ এখন প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ অপারেটর গ্রামীণফোনের মোট বিনিয়োগ ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৩৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অবশিষ্ট বিনিয়োগের মধ্যে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রবি, এয়ারটেল ও বাংলালিংকের। প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া সিটিসেলের। সবচেয়ে কম বিনিয়োগ রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটকের- মাত্র পাঁচ হাজার কোটি টাকার মতো।

টেলিটকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা, বিনিয়োগ পরিকল্পনা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা। যেমন- ২০১৩ সালে টেলিটক সবার আগে থ্রিজি সেবার অনুমোদন পেয়েছিল। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য টেলিটক তখন সরকারের কাছে দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ চেয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে বিনিয়োগের পরিমাণ কমিয়ে ৬৭৮ কোটি টাকায় নামিয়ে আনে। এমনকি পরিকল্পিত এই অনুমোদনেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আরও প্রায় ছয় মাস কেটে যায়। ততদিনে বেসরকারি মোবাইল অপারেটররাও থ্রিজি সেবায় চলে আসে। এ সেবার শুরুতেই গ্রামীণফোন প্রায় চার হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ করে। এ ছাড়া রবি প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার এবং বাংলালিংক প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ করে থ্রিজি নেটওয়ার্ক সক্ষমতা গড়ে তোলে। অন্যদিকে বিনিয়োগ অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতায় থ্রিজি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে টেলিটক পিছিয়ে পড়ে।

টেলিযোগাযোগ খাতের সাবেক একজন বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পর্ষদও এর পিছিয়ে থাকার একটি বড় কারণ। এ ব্যবস্থাপনা পর্ষদে বিশেষজ্ঞের চেয়ে সরকারি আমলা এবং টেলিযোগাযোগ খাত সম্পর্কে জানাশোনা কম এমন সদস্যই বেশি। তাই টেলিটকের যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বোর্ডসভা পার করতেই একটা লম্বা সময় চলে যায়। বোর্ডসভা করে কোনো প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে যাওয়ার পর সেটির অনুমোদন পেতে চার-পাঁচ মাস থেকে পুরো বছরও পেরিয়ে যায়। এতে টেলিটকের পক্ষে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়াই সম্ভব হয় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই বিশেষজ্ঞ বলেন, টেলিটককে এগিয়ে নিতে হলে ব্যবস্থাপনা পর্ষদে টেলিযোগাযোগ খাত বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তবে পরিচালনা পর্ষদের কাঠামো পরিবর্তন খুব সহজ নয়। এ জন্য কোম্পানির আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন বদলাতে হবে। আর এ জন্য আইনগত প্রক্রিয়া আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। তাই টেলিটককে এগিয়ে নিতে হলে সরকারকে সবকিছু বিচার-বিশ্নেষণ করে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

টেলিটকের জন্য নতুন বিনিয়োগ :সূত্রমতে, টেলিটকের নেটওয়ার্ক সমক্ষতা সারাদেশে সমানভাবে সম্প্রসারণের জন্য কমপক্ষে আরও নয় হাজার বিটিএস প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজন একসঙ্গে আট থেকে দশ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। বর্তমানে টেলিটকের টুজি, থ্রিজি এবং ফোরজি মিলিয়ে মোট সাড়ে চার হাজার বিটিএস রয়েছে। ফোরজি নেটওয়ার্ক ঢাকা এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে সীমিত পরিসরে আছে। অথচ গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক- প্রত্যেকেরই বিটিএস সংখ্যা গড়ে প্রায় নয় হাজার।

টেলিটকের জন্য নতুন বিনিয়োগ সম্পর্কে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, আশা করা হচ্ছে, সারাদেশে টেলিটকের ফোরজি নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং ফাইভজি প্রস্তুতির জন্য সৌদি টেলিকমের পক্ষ থেকে প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পাওয়া যাবে। এ ছাড়া, সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকেও প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার নতুন একটি প্রকল্পের ডিপিপি তৈরি করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, টেলিটক সক্ষম হয়ে উঠলে গ্রাহকরা কম খরচে মানসম্পন্ন সেবা পাবেন। পাশাপাশি বাজারে তাদের কোনো অপারেটরের একচেটিয়া মনোভাবের শিকার হতে হবে না। সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থেই টেলিটককে সক্ষম করে তোলার জন্য নতুন এ বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পর্ষদে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা আছে কি?- এ প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন টেলিটক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা চলতি দায়িত্বের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়ে চলছিল। বর্তমানে এখানে একজন নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থাপনাকে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এটা করা হয়েছে। অচিরেই ব্যবস্থাপনা পর্ষদের বর্তমান কাঠামোর ভেতরেই আরও বেশি বিশেষজ্ঞকে সদস্য করার উদ্যোগও নেওয়া হবে।

 

লেখক রাশেদ মেহেদী, সদস্য টিআরএনবি

দৈনিক সমকাল, প্রকাশ ৩০মে

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here