টিআরএনবি সদস্যদের সংগে সিম্ফনি মোবাইল ফোন কর্মকর্তাদের মতবিনিময়

বিশেষ প্রতিনিধি : স্মার্টফোন সাধারণ ভোক্তাদের নাগালে আনতে যেসব মোবাইল ফোন ব্র্যান্ড অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে তাদের মধ্যে অন্যতম এডিসন গ্রুপের সিম্ফনি মোবাইল। প্রথমে আমদানিনির্ভর হলেও ২০১৮ সাল থেকে স্থানীয় ভাবেই প্রতিষ্ঠানটি স্মার্টফোন তৈরি করছে।

একসময় মোবাইল হ্যান্ডসেট ছিল অধিকাংশ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। প্রায় ৮২ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন কিনতে পারত না। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে মোবাইল ফোনের আওতায় নিয়ে আসতে ভাবতে শুরু করেন এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা।

সিম্ফনির যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে। সিম্ফনি মার্কেটে আসার আগে মানসম্পন্ন মোবাইল ফোন ছিল অধিকাংশ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বেশী টাকা দিয়ে মোবাইল কিনতে পারলেও মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত মানুষ তা ক্রয় করার ক্ষমতা রাখতো না। তখন সিম্ফনির উদ্যোক্তাদের চিন্তা আসে কিভাবে স্বল্প দামে মানসম্পন্ন মোবাইল ফোন মানুষের হাতের নাগালে দেয়া যায়।

সেই পরিকল্পনা থেকেই চীন থেকে মোবাইল ফোন তৈরি করে আমদানি করা হয় দেশে। ভোক্তাদের তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় মোবাইল ফোনসেট হাতে তুলে দেওয়া শুরু করে সিম্ফনি। এর পর থেকেই বাংলাদেশের বাজারে উত্থান শুরু হয় সিম্ফনির।

প্রকৃত অর্থে ২০১০-১১ সময়টি ছিল সিম্ফনির উত্থানের গল্প। বলা যায়, একটি কোম্পানির স্বল্প সময়ে উঠে আসার ইতিহাস। এ সময় বিশ্বখ্যাত ফিনল্যান্ডের নকিয়া ফোনকে ছাড়িয়ে বিক্রয়ের দিকে দেশের এক নম্বর ফোন এর স্বীকৃতি অর্জন করে সিম্ফনি, যা সারা বিশ্বের মধ্যে লোকাল কোম্পানি হিসেবে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বাধিক বিক্রিত ব্র্যান্ড হিসেবে সিম্ফনি তার নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। পাশাপাশি ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম কতৃক মোবাইল ফোন ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ ব্র্যান্ডের খেতাব অর্জন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের শেষ দিকে এসে দেশে স্মার্টফোন উত্পাদন শুরু করে সিম্ফনি।

সিম্ফনি সবসময়ই মানের ব্যাপারে আপোহীন। সিম্ফনি প্রথম থেকেই পণ্যের গুণগত মান ঠিক রেখে,  নতুন নতুন প্রযুক্তি, এবং সর্বোচ্চ বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে সেরা ব্র্যান্ড হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে যা এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

দেশে প্রতি মাসে স্মার্টফোনের চাহিদা প্রায় সাড়ে নয় থেকে দশ লাখ ইউনিটের। যার ৭০ শতাংশ এখন দেশেই উৎপাদন হচ্ছে। বাকি ৩০ শতাংশ এর মধ্যে ২৫ শতাংশই অবৈধ বাজার বা গ্রে মার্কেট এর মাধ্যমে অসাধু ব্যাবসায়ীরা সরবরাহ করছে এবং সরকার এখান থেকে রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা। আর ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন মোবাইলফোনের বৈধ ব্যাবসায়ী এবং উদ্যোক্তাগণ।

মাসে এক লাখ থেকে এক লাখ ২৫ হাজারের সিম্ফনি স্মার্টফোনের চাহিদা আছে বাজারে। এর পুরোটা সিম্ফনি স্থানীয়ভাবে দিচ্ছে। মোট বাজার ছয় থেকে সাত লাখ বৈধ মোবাইল ফোনের বাজার আছে।

বাংলাদশের মোট মোবাইল ফোনের বাজার প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি যা মূল্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।  এর মধ্যে স্মার্টফোনের বিক্রি আছে ৩০ শতাংশ এবং ৭০ শতাংশ হচ্ছে ফিচার ফোনের বাজার।

ভারত ১০ বছর ধরে দেশীয় উৎপাদনকে বিভিন্ন ভাবে প্রনোদণা দিচ্ছে যারফলে তাঁদের চাহিদার ৭০ শতাংশ মোবাইলফোন দেশীয় উতপাদনে দিতে পারছে আর আমরা বাংলাদেশে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সম্ভব করেছি মাত্র গত দুই বছরে।

দেশের চাহিদা পূরণ করে সিম্ফনি খুব শীঘ্রই দেশের বাইরে মোবাইল ফোন রপ্তানি করবে। বিশেষ করে মধ্যপাচ্য ও ভারতের সেভেন সিস্টারে বিপুল পরিমাণ সম্ভাবনা আছে। বর্তমানে সিম্ফনি ভিয়েতনাম এবং শ্রীলঙ্কায়  তাঁদের ব্যাবসা প্রসার করেছে।

এই খাতে প্রায় দুই হাজার কর্মী কাজ করেন। তাঁদের অধিকাংশই পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের ছাত্র। সিম্ফনিতে প্রায় ৯৮০ কর্মী কাজ করেন। আগামী কয়েক বছরে এই সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

বাংলাদেশের বাজারে এখনো অনেক মানুষ থ্রি জি ফোন ব্যাবহার করছেন। আর তাই সিম্ফনি আগে থ্রি জি আর ফোর জি’র মার্কেটে সিম্ফনির দখল নিশ্চিত করতে সচেস্ট হয়েছে। এখন এই কারখানা থেকে প্রতি মাসে ১লাখ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার পর্যন্ত স্মার্টফোন বাজারে যাচ্ছে এবং সিম্ফনির মূল প্ল্যানই ছিল চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সিম্ফনির কারখানা থেকেই যাতে পরিপূর্ণ ভাবে স্মার্টফোন বাজারজাত করা যায়।

বাংলাদেশের প্রায় ৭০ ভাগের বেশী মানুষ এখনো ফিচার ফোন ব্যাবহার করছেন, আর তাই সিম্ফনি এখন আস্তে আস্তে ফিচার ফোন উৎপাদনের দিকেও জোর দিচ্ছে। আশা করা যায় আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সিম্ফনি ফিচার ফোন এবং স্মার্টফোন মিলিয়ে মাসে সাড়ে পাঁচ লাখ থেকে ছয় লাখ ফোন উৎপাদন করে বাজারজাত করতে পারবে।

ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার জিরাবোতে সিম্ফনির এই ফ্যাক্টরি উদ্বোধন করা হয় ২৩ শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে এবং ওই বছরের ডিসেম্বর থেকেই সিম্ফনি মেড বাই বাংলাদেশ ফোন বাজারজাত করা শুরু করে। সিম্ফনি’র ফ্যাক্টরিতে সবমিলিয়ে এখন প্রায় সাড়ে পাঁচ শত মানুষ কাজ করছেন।

সিম্ফনি মোবাইলের এ্যাসেম্বলিং প্ল্যান্টটি প্রায় ৫৭ হাজার বর্গফুট জমির উপরে তৈরি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে প্রায় ৮.১৬ একর এবং আশুলিয়াতে নিজস্ব ১ লক্ষ ৭২ হাজার ৮০০ স্কয়ার ফিট জমির ওপরে আরো দুটি কারখানা তৈরি করছে সিম্ফনি। এই তিনটি কারখানায় এখন পর্যন্ত সিম্ফনির খরচ হয়েছে ১০০ কোটি টাকার মতো কিন্তু প্রডাকশন ক্যাপাসিটি বাড়ার সাথে সাথে এই টাকার পরিমাণ ভবিষ্যতে বাড়তেও পারে।

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here