টিআরএনবির আলোচনা : করের বোঝায় থমকে যাবে টেলিকম খাতের প্রবৃদ্ধি

টেলিকম খাতে করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে এর প্রবৃদ্ধিকে আটকে দেয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও খাতসংশ্লিষ্টরা। প্রস্তাবিত ‘বাজেট : টেলিকম খাতের বাস্তবতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বুধবার এ মন্তব্য করেন তারা। রাজধানীর লা ভিঞ্চি হোটেলে টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) এটি আয়োজন করে।

টিআরএনবির সভাপতি মুজিব মাসুদের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (কর জরিপ ও পরিদর্শন) মেফতাহ উদ্দিন খান, টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইফুল ইসলাম, রবির সিইও মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, টেলিটকের ডিজিএম সাইফুর রহমান খান, মোবাইল ফোন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ, গ্রামীণফোনের ডিরেক্টর ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স হোসেন সাদাত, এমটবের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল টিআইএম নুরুল কবির, রবির চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম, টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল আনোয়ার খান শিপু প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিআরএনবির অর্থ সম্পাদক শামীম জাহাঙ্গীর। টিআরএনবির সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

রবির সিইও মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি আমাদের সঙ্গে থাকে তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। টেলিকম খাতে আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ সরকারের খাতে চলে যায়। টেলিটক আইসিইউতে রয়েছে। এটি বাদে বর্তমানে তিনটি কোম্পানি রয়েছে। তারাও যদি টিকে থাকতে না পারে তাহলে তা এই খাতের জন্য নেতিবাচক হবে। ২১ বছর ব্যবসা করার পরেও যখন মুনাফা করার স্বপ্ন দেখতে পারি না তখন বুঝতে হবে আসলেই পরিস্থিতি খুব খারাপ।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইল ফোনে সিম ও রিম কার্ডের ওপর আরোপিত সম্পূরক শুল্ক হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। সিম কার্ডের ওপর আরোপিত শুল্ক ১০০ থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা, পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর রিটেইনড আর্নিং বা আয়ের সঞ্চিতির ওপর ১৫ শতাংশ হারে শুল্কারোপ, মোবাইল কোম্পানির আয়ের ওপর সর্বনিম্ন শুল্ক ০ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ এবং স্মার্টফোন আমদানিতে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কারণে বিনিয়োগ নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। অন্তত রবির আসবে।

তিনি আরও বলেন, এখানে লাভ না করার পরও বাধ্যতামূলকভাবে সর্বনিম্ন শুল্কের বোঝা টেলিকম খাতের জন্য চাপানো রয়েছে। এটা আগের পৌনে এক শতাংশ থেকে এখন ২ শতাংশ করে দেয়া হয়েছে। তার মতে লোকসান করে এই কর তো মূলধন থেকে দিতে হবে।

মোবাইল ফোন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, যে সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাব বলে সরকার ঘোষণা দিয়েছে, সেখানেই করের বোঝা চাপানো হচ্ছে। এটি মূলত মোবাইল ফোন গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা। এই খাত থেকে করের বোঝা কমানোর দাবি জানান তিনি। টেলিটকের ডিজিএম সাইফুর রহমান খান বলেন, টেলিকম খাতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক আরোপের ফলে লোকসানের পরিমাণ বেড়ে যাবে। এতে আমাদের মতো ছোট কোম্পানির জন্য টিকে থাকা কঠিন হবে।

বাংলালিংকের হেড অব ট্যাক্স সারোয়ার হোসেন খান বলেন, সরকারের বেশ কিছু টার্গেট রয়েছে। আর এই টার্গেট পূরণের জন্য টেলিকম খাতকে বেছে নেয়া হয়েছে। অথচ অন্যান্য খাতকেও টার্গেট করা যেতে পারে। এ ধরনের পরোক্ষ কর না বাড়িয়ে আয়করের দিকে সরকারের বেশি নজর দেয়া উচিত।

গ্রামীণফোনের ডিরেক্টর ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স হোসেন সাদাত বলেন, এই খাতের মধ্যে আমরাই প্রথম পুঁজিবাজারে গিয়েছি। এজন্য কর্পোরেট ট্যাক্সের ওপর ১০ শতাংশ কর রেয়াত দেয়া হবে। পুঁজিবাজারে যাওয়ার তিন বছরের মাথায় কর রেয়াত ৫ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হয়। এতে করে অন্য কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে যেতে নিরুৎসাহিত হবেন।

এমটবের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল টিআইএম নুরুল কবির বলেন, টেলিকম খাতে ১০ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, যা বিশ্বের কোথাও নেই। সেই সঙ্গে সিম ট্যাক্স এই খাতের প্রবৃদ্ধিকে থামিয়ে দিচ্ছে। সফটওয়্যার খাত প্রণোদনা পেয়েছে। অথচ কখনও প্রণোদনা চায়নি। যদি সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে চায় তাহলে কেন ইন্টারনেট ফ্রি করা যাবে না। বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা এদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কেন হচ্ছে তা খুঁজে বের করা দরকার।

রবির চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, প্রস্তাবিত ট্যাক্স বাস্তবায়িত হলে সরকার তিন হাজার কোটি টাকা বেশি পাবে। সরকার যদি সিম ট্যাক্স না বাড়ায় তাহলে এই খাতে সরকার ট্যাক্স পেত ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (কর জরিপ ও পরিদর্শন) মেফতাহ উদ্দিন খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সমন্বয় করেই কর কিংবা ভ্যাটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এটি এককভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিদ্ধান্ত নয়।

তিনি বলেন, স্ম্যার্টফোনের সুফলের চেয়ে কুফলও বেশি দেখা যাচ্ছে। খুব বেশি স্মার্টফোনের দরকার নেই। সব নীতিমালাতে ভালো ফল দেবে তা আশা করতে পারেন না। স্বর্ণের ডিমপাড়া হাঁস মেরে ফেলতে চাই না, যেভাবেই হোক একে বাঁচিয়ে রাখব।

আরও পড়ুন
SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here